সকাল ০৯:৪৬ ; রবিবার ;  ১৮ নভেম্বর, ২০১৮  

দেশে তৈরি ‘ওকে’ মোবাইল যাচ্ছে বিশ্ববাজারে

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

হিটলার এ. হালিম॥

দেশে তৈরি ‘ওকে’ মোবাইল বাংলাদেশের বাজার মাতিয়ে পা দিতে যাচ্ছে বিশ্ববাজারে। রফতানি চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে গেছে, প্রস্তুতিও চূড়ান্ত। সেপ্টেম্বরের মধ্যে জাপানে রফতানি শুরু হবে এই মোবাইলফোন সেট। প্রথমদিকে যাবে মোবাইলের যন্ত্রাংশ। এরমধ্যে রয়েছে ব্লু-টুথ ওয়্যারলেস হেডসেট, ব্ল-টুথ হেডফোন, কার চার্জার, ইউএসবি ক্যাবল, ব্যাটারিসহ অনেক কিছু। পরবর্তী সময়ে আফ্রিকা, ব্রাজিল, মেক্সিকোসহ দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশে এই মোবাইলসেটগুলো রফতানির পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে রমজান মাসে নতুন ১০টি নতুন মডেলের ‘ওকে’ মোবাইলসেট বাজারে আসছে। ঈদকে সামনে রেখে ১৫ জুন বাজারে ছাড়া হবে ২ হাজার ২৫০ টাকা (ডিলার মূল্য) দামের একটি সেট। ছাড়া হবে কমদামের মধ্যে স্মার্টফোনও।

গত বছরের জুলাই মাসে মোবাইলপ্রেমীদের হাতে কমদামে ভালো ফোন বিশেষ করে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে বাজারে আসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে তৈরি মোবাইলফোন সেট 'ওকে মোবাইল।' উদ্বোধনের দিন একসঙ্গে ৫টি মডেলের মো‌বাইল সেট বাজারে ছাড়ে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ৩টি ছিল স্মার্টফোন ও ২টি ছিল ফিচার ফোন।

এ বিষয়ে বলতে গিয়ে ওকে মোবাইল লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট কাজী জসিমুল ইসলাম বললেন, আমাদের দেশে থ্রি-জি আছে কিন্তু তা ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত ডিভাইস নেই। আমরা দেখলাম দেশের মাত্র ৪ শতাংশ মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করে। অবশিষ্টরা ব্যবহার করে ফিচার বা বার ফোন। যদিও সরকারি একটি ঘোষণা আছে, আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে সারাদেশে থ্রিজি পৌঁছতে হবে। সে হিসেবে আমাদের মনে হয়েছে ২০১৫ ও ২০১৬ সাল বাংলাদেশের বাজার মোবাইলফোন সেটের জন্য স্বর্ণযুগ। আমরা এই সময়টাকেই বেছে নিয়েছি। দেশে উদ্যোক্তার অভাব উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের মোবাইল ব‌‌‌াজারের 'সাইজ' সাড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। কোনও উদ্যোক্তা না থাকায় নিজেরা কিছু একটা করা যায় কি না, সেই তাড়না থেকেই মোবাইল উৎপাদনে আসা।

এক প্রশ্নের জবাবে কাজী জসিমুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মোবাইলফোন সেট আমদানিতে শুল্ক দিতে হয় ২১.৫ শতাংশ। আর মোবাইলের কাঁচামাল আমদানি করতে শুল্ক দিতে হয় ৫৬ শতাংশ। এই বিশাল ব্যবধানের কারণে দেশে এখনও মোবাইলফোন শিল্প গড়ে উঠছে না। আমরা কম দামের মোবাইল সেট তৈরি করে 'বেশি সংখ্যায়' বিক্রি করে শুল্ক বিষয়ক ঘাটতি পুষিয়ে নিতে চাই। তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণত চীন থেকে আমাদের দেশের শিল্পপতি বা ব্যসায়ীরা মোবাইলফোন তৈরি করে আনেন। চীনের ওইসব কারখানার প্রকৌশলী এবং কর্মীদের বেতন বিশাল অংকের। এ কারণে মোবাইল তৈরিতে খরচও অনেক বেশি পড়ে। আমরা চীনের প্রকৌশলী এনে আমাদের স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তুলেছি। এই যোগ্য কর্মীরাই এখন মোবাইল সেট তৈরি করছে। ফলে মোবাইল সেট তৈরির খরচও কম পড়ছে। আমরা এসব কৌশল অবলম্বন করে সফল হওয়ার চেষ্টা করছি। তবে তিনি সরকারের প্রতি মোবাইলের কাঁচামালের আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেশে মোবাইলশিল্প গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

মোবাইলের নাম ‘ওকে’ কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে কাজী জসিমুল ইসলাম বলেন, সেট ওকে; ব্যাটারি ওকে; চার্জার ওকে; ক্যামেরা ওকে; টেকনোলজি ওকে; হার্ডড্রাইভ ওকে। তাহলে কেন মোবাইলের নাম 'ওকে' হবে না? তিনি আরও বলেন, ওকে নামটির গ্রহণযোগ্যতাও বেশ। শব্দটি যেকোনও মানুষের মুখে-মুখে ফেরে। আমরা এই বিষয়টিকেই আসলে ধরতে চেয়েছি। তিনি আরও বলেন, আমরা এখন প্রতিদিন ১ হাজার সেট তৈরি করছি। শিগগিরই প্রতিদিন ৪ হাজার সেটের উৎপাদনে যাব। তবে আমাদের প্রতিদিন ৮ হাজার সেট তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। দিনি দাবি করেন, ওকে মোবাইল-ই দেশে তৈরি প্রথম মোবাইলফোন। এটিই 'মেড ইন বাংলাদেশ'-এর প্রথম মোবাইল হ্যান্ডসেট।

জার্মানি, চীন ও তাইওয়ান থেকে ওকে মোবাইলের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করা হয়। কাজী জসিমুল ইসলাম স্বপ্ন দেখেন, একদিন দেশেই মোবাইলফোনের যন্ত্রাংশ তৈরি করবেন।

প্রসঙ্গত, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিআর) মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থায় (টেশিস) ‘ওকে’ মোবাইল ফোনসেট তৈরির কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। টেশিসের সঙ্গে যৌথভাবে ইনডিগো বিডি ও শান্তা গ্রুপ ওকে মোবাইল তৈরি ও বাজারজাত করছে। কারখানার জন্য টেশিসের কাছ থেকে জায়গা এবং বিদ্যমান অবকাঠামো ভাড়া নিয়েছে ওকে মোবাইল।

রমজানে সছে ১০টি মডেলের নতুন সেট

রোজায় ‘ওকে’ মোবাইলের ১০টি নতুন মডেলের সেট বাজারে ছাড়া হবে বলে জানা গেছে। কে-১০ মডেলের ফোন সেটের দাম হবে ১ হাজার ৪৫০ টাকা। এতে থাকবে ২.৪ ইঞ্চি স্ক্রিন এবং থাকবে রোটেটিং ক্যামেরা। এম-৯ নামের একটি সেট ছাড়া হবে। এটিকে বলা হচ্ছে কমদামের সেলফি মোবাইল। কারণ এতে থাকবে রোটেটিং ক্যামেরা। জুপিটার-৫ মডেলের একটি স্মার্টফোনও রোজায় বাজারে আসবে। এর দাম ৮ হাজার ৫০০ টাকা। ‍

কে-৫ মডেলের অ্যান্ড্রয়েড ফোনও তৈরি করেছে ওকে মোবাইল। এর দাম ৩ হাজার ১০০ টাকা। কাজী জসিমুল ইসলাম বলেন, এই দামে আর কেউ অ্যান্ড্রয়েড ফোন বাজারে বিক্রি করতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, আমরা এম-৬ মডেলের একটি সেট তৈরি করেছি, যেটি একটি বাটন দিয়ে থ্রিজি সেবা ব্যবহার করা যাবে। এর স্ক্রিনের আকার ৩ ইঞ্চি। দাম ২ হাজার ২৫০ টাকা। 

 

বাংলাস্কোপ টিভি

জানা গেল, ওকে মোবাইল বাংলাস্কোপ নামের একটি মোবাইল টেভি চালু করতে যাচ্ছে। আগামী অক্টোবরের ১ তারিখে এই টিভি চালু হবে। সব মোবাইলফোন থেকেই এই টিভি চ্যানেল দেখা যাবে। প্রতিটি অনুষ্ঠান (কনটেন্ট) হবে ৩-৫ মিনিটের। ওকে মোবাইলে এই টিভি বিল্ট-ইন থাকবে। টিভির অ্যাপও তৈরি করা হবে। যেকোনও মোবাইলে বাংলাস্কোপ অ্যাপ ডাউনলোড করে সহজেই এই টিভি দেখা যাবে।

 

নারী নয়, উদ্যোক্তা

কাজী জসিমুল ইসলাম জানালেন, ‘ওকে’ মোবাইল কর্তৃপক্ষ একটি ট্যালেন্টহান্ট প্রোগ্রাম করতে যাচ্ছেন। আগস্ট মাসে এই প্রোগ্রাম করে সারাদেশ থেকে উদ্যোক্তা খুঁজে বের করা হবে। তার মতে, আমরা সেইসব নারীকে খুঁজে বের করব, যারা ব্যবসা পরিচালনা করবেন। নারী হলেও আমরা তাদের নারী বলব না। বলব উদ্যোক্তা।

তিনি জানালেন, দেড় বছরের মধ্যে আমরা মোবাইল সেট বিক্রি করতে সারাদেশে ১ হাজার ৫০০ আউটলেট তৈরি করব। ওই আউটলেটগুলো পরিচালনা করবেন নারী উদ্যোক্তারা। একটি আউটলেটের সবাই থাকবেন নারী কেবল নিরাপত্তা রক্ষী থাকবেন পুরুষ। জানা গেল, বর্তমানে ‘ওকে’ মোবাইলের ১৭টি বিক্রয় ও সেবা কেন্দ্র রয়েছে। ডিস্ট্রিবিউটর রয়েছে ১৬০টি।

/এমএনএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।