রাত ১১:৩৬ ; মঙ্গলবার ;  ২১ নভেম্বর, ২০১৭  

ফিরেও ফিরে আসেনি পাচার হওয়া সুমী

প্রকাশিত:

উদিসা ইসলাম।।

বছরে অন্তত ১৫ হাজার নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে। এমন তথ্য জানাল পাচারবিরোধী সংগঠনগুলো। তবে ওই নারী-শিশুরা কে কোন পথে কোথায় যায় সে বিষয়ে কারও কাছে কোনও তথ্য নেই। যারা পাচার হওয়া মানুষদের পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করেন তারা বলছেন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বা ব্যক্তিগতভাবে মাঝে মাঝে কেউ ফিরে আসার পথ খুঁজে পেলেও পরিবারে জায়গা হয় না তাদের।

তেমনই একজন সিরাজগঞ্জের সুমি আখতার। পাচার হয়েছিলেন ১৩ বছর বয়সে। কলকাতা হয়ে পাকিস্তান দিয়ে অবৈধ পথে পৌঁছে গিয়েছিলেন আফগানিস্তান। কাঁটাতার পেরিয়ে আবার দালাল ধরেই ফিরে এসেছেন দেশে। ততদিনে কেটে গেছে ছয় বছর। বাড়ি ফিরে পরিবারের একমাত্র সদস্য মায়ের মৃত্যুসংবাদ পান। অন্য আত্মীয়রা তাকে ঘরে জায়গা দেয়নি।

এলাকারই এক ভাইয়ের হাত ধরে ফের ঢাকায় আসেন সুমি। সুযোগ পেয়েও ফেরা হয়নি চেনা সমাজে। এখন তিনি ঢাকায় ভাসমান যৌনকর্মীদের কাছে সস্তায় কনডম বিক্রি করে জীবিকা চালাচ্ছেন।

“বিয়ের পরদিন উনি (স্বামী) কইলেন আমারে নিয়া কয়দিন ঘুইরা ফিইরা কলিকাতা নিয়া যাবেন। সেখানে তার বিরাট ব্যবসা। সাতদিন পর আমরা গেলাম। প্রথমে বলসিল ট্রেনে যাব যশোর, তারপর হাঁটা পথে ওপারে। কিন্তু পরে গোদাগাড়ি দিয়া ভোরবেলা অন্ধকার থাকতে পার হলাম নদী, তারপর হাঁটা কয়েকঘণ্টা। আবার নদী পার হয়ে ওপারে। চরে হাঁটতে হাঁটতে যখন ওপারে পৌঁছাই তখন রাত আটটা। সেইদিন ছিলাম একেবারে নদীর পাড়ের এক বাসায়। এলাকার কিছুই সেভাবে বলতে পারবো না। বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ ছিল।’

কিভাবে ভারত গেল, বিয়ে করলো, স্বামীর সাথে কিভাবে পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তানে গিয়ে পৌঁছালো সে লম্বা কাহিনী শোনাল। জানাল, ওখানে বাংলাদেশের মেয়েরা আছে। অনেক মেয়ে। যখন দেখে ফেরার উপায় নাই তখন তারা নিজেদের ভারতীয় বলে পরিচয় দেয়। ফলে বাংলাদেশি কতজন আছে সে হিসাব বের করা কঠিন।

ফিরে আসা প্রসঙ্গে সুমি বলেন, ফেরা আমাদের সেই অর্থে হয় না। কতজন খুন হয়ে গেছে তার হিসাব নাই। বাবা মায়ে মনে করে তার সন্তান বিদেশে সুখেই হয়তো আছে। খোঁজ জানে না।

সুমি ভারতে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর স্বামী রবিউলের সাথে প্রথম আশ্রয়স্থল (আলাইপুর, মুর্শিদাবাদ) থেকে বের হয়ে কলকাতায় যান। নিষেধ ছিল রাস্তায় কোনও কথা বলা যাবে না। কথা বললেই নাকি লোকে বুঝে যাবে আমি বাংলাদেশের মেয়ে। পরে সেখান থেকে বহরমপুর এসে ট্রেনে কলকাতা পৌঁছানোর পর কোথায় নিয়ে গিয়েছিল বলতে পারি না। পরে জানসি বউবাজারের হারকাটা গলি। পুরান দালান, অনেক মানুষ। সেখানে রেখে চলে যাওয়ার পর ওই লোকের দেখা আমি পাইনি।

জীবনযুদ্ধে জয়ী সুমি বলেন, আমি প্রথম দু-তিনদিন বুঝিনি আমাকে বিক্রি করা হয়েছে। যার কাছে বিক্রি করেছিল সেই রেশমাদি বলেছেন বিয়ে এবং পথখরচ বাদে ত্রিশ হাজার রুপিতে আমাকে বিক্রি করে দিয়েছে।

সুমি বলেন, আমাকে রেশমাদি কোনদিন কোথাও পাঠায়নি। তার নিয়ন্ত্রণে ১২জন যৌনকর্মী ছিল। তাদের কোথায় কবে যাওয়া, কত টাকা আনলো, সেই টাকার কমিশন কোথায় কোথায় যাবে সেসব হিসাবের দায়িত্ব ছিল আমার। অন্য মেয়েরা রোজ বাবুদের সাথে বাইরে যেত, ওরা খুব কান্নাকাটি করতো।

এরপর? সুমী অন্যদের সাথে নাচ, সাজগোজ, রঙবেরঙের চুল কাটা শেখেন। বলেন, তখনও বুঝিনি, আমাকে অন্যকিছুর জন্য তৈরি করা হচ্ছে। আমাকে সেখান থেকেও পাচার করার পরিকল্পনা করে ফেলেছিলেন রেশমাদি। সুমি বলেন, ভারতে অনন্ত কয়েক হাজার বাংলাদেশি মেয়ে যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করছে।

পাচারের পথ বলতে গিয়ে সুমি বলেন, কলকাতা থেকে আমাদের নয়জনকে একসাথে পাঠানো হলো আফগানিস্তান। সে এক দুঃসহ স্মৃতি। ট্রেনে জয়সলমির দিয়ে উটের পালের সাথে সীমানার কাছাকাছি গিয়ে একটা বিরান এলাকায় আমাদের রাখা হয়। সেখানে আফগানিস্তান সীমান্তের দালাল এসে আমাদের পার হওয়ার ব্যবস্থা করে। বিশ্বাস করেন, নয়জন মেয়ে একবেলা করে খেয়েছি। সারাশরীর এমনভাবে রাজস্থানি পোশাকে মোড়ানো যাতে আমাদের কেউ দেখে না ফেলে। তিনদিন পর আফগানিস্তানের নওয়াবশাহ এলাকায় যাই। আমাদের নয়জনের মধ্যে তিনজন মেয়ে পাকিস্তানেই থেকে গেছে। মধ্যবর্তী দালালরা তাদের সেখানে আরেকদফা বিক্রি করে।

আফগানিস্তানে তাদের একেকজন একেক জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়। সুমী বলেন, আফগানিস্তানে বাংলাদেশ ও ভারত থেকে আসা অনেক নারীকে যৌনকর্মী হিসেবে জীবন যাপনে বাধ্য করা হচ্ছে। অবৈধ অভিবাসী হওয়ায় তারা কোনও সহযোগিতাই চাইতে পারে না। কাউকে অত্যাচার করে মেরে ফেলে হলে সেটার খবরও কেউ পায় না।

সেখানে দুইবছর থাকার পর এক দালালের সহায়তায় বাংলাদেশি টাকায় ৫০ হাজার খরচ করে যে পথ দিয়ে গিয়েছিলেন সেই পথে কলকাতায় ফেরার ব্যবস্থা করেন। পরে আরেকদফা দালালের সাথে যোগাযোগ করে বেনাপোল দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকেন তিনি।

এখন কেমন আছেন জানতে চাইলে সুমী বলেন, আমার এখন এমন কারোর সাথে পরিচয় নাই যারা আমার আগের কুড়ি বছরের জীবন সম্পর্কে জানে। ফলে ফিরে এসেও আমার আসলে ফেরা হয়নি।

/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।