সকাল ১১:৩৩ ; শনিবার ;  ২১ জুলাই, ২০১৮  

প্রেম বিষয়ে ইঁদুর-বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথন || দিলওয়ার হাসান

প্রকাশিত:

গভীর বিষাদে আক্রান্ত হয়ে এক রাতে রবিন এক বোতল মৃত সঞ্জিবনী সুধা নিয়ে বসল। টাকার অভাবে ভালো কোনো মদ কিনতে পারেনি।

একটা চিলে কোঠায় একা থাকে সে। ওই রাতে তার ঘরে খাবারও ছিল না। শাস্ত্র মতে খালি পেটে মদ পান করতে নেই। টেবিলের ওপর কাল সকালের নাশতার কয়েক টুকরো পাউরুটি ছিল। পেঁয়াজ কুচির সঙ্গে একটুখানি লবণ মিশিয়ে অনুপানের আয়োজন নিল সে। এমনিতেই গভীর বিষণ্ণতায় ডুবে ছিল, ঘরে খাবার না-থাকায় সেই বিষণ্ণতা আরও বাড়ল। মনে পড়ল পিকাসোর আঁকা ‘ফ্রুগাল রিপাস্ট’ ছবির বিমর্ষ কঙ্কালসার দুই নর-নারীর কথা। হ্যাট পরিহিত অন্ধ যুবকের ডান হাতের পাতা সঙ্গীনির ডান বাহুর ওপরে রাখা। বাম হাতটি স্থাপিত ওর কাঁধে। যুবক অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। বিপর্যস্ত ভঙ্গিমায় চিবুকে হাত রেখে বসে আছে মেয়েটা। টেবিলে পড়ে আছে শূন্য একটা থালা। পাশেই একটা মদের বোতল ও গ্লাস। ছবিটা থেকে ঠিকরে বেরুচ্ছে বিষণ্ণতা, দারিদ্র্য আর অভিশপ্ত অন্ধত্ব। মন খারাপ করা ছবি।

রবিন ভাবল তাকে এ অবস্থায় দেখলে পাবলো কি একটা ছবি আঁকতেন? রাত তখন ১১টা ছাড়িয়ে গিয়েছিল আর আশপাশের ঘরবাড়িতে নানা আয়োজন চলছিল টেলিভিশনে। মাথার ওপর লো ভোল্টের হলুদ একটা বাতি জ্বলছিল। পাখাটা ঘুরছিল ঢিমে তালে। চল্লিশ বছর ধরে ঘুরছে। ঘুরতে ঘুরতে একেবারে হয়রান। ফ্যানটা রবিনের নয় বাড়িওয়ালার। ভাড়া দেওয়ার সময় দয়া করে খুলে নেয়নি।

তখন খচমচ শব্দ করে টেবিলের ওপরে স্থাপিত তাকিয়াটার ওপর একটা ধাড়ি ইঁদুরের আবির্ভাব ঘটল। রবিন ডাকল তাকে, ‘হাই ডাই রট্টিন কেমন আছ?’

‘ডাই রট্টিন? বাংলাও নয়, ইংরেজিও নয়, কোন ভাষা প্রভূ?’

‘কে প্রভূ? আমাকে প্রভূ ডাকছ কেনো?’

‘আপনি তো আমার প্রভূই। আপনার উচ্ছিষ্ট খাবার-দাবার খেয়েই তো বেঁচে আছি। আপনার এই ঘরটা আমার একমাত্র আশ্রয়স্থল।’

‘তাতে কী? আমি কি তোমার ওপর প্রভূত্ব করি? আমার নিয়ম কানুন, মতামত বা আদর্শ কি তোমার ওপর চাপিয়ে দেই, কিংবা ধরো তোমাকে দিয়ে ফাই ফরমাস খাটাই?’

‘তুমি বরং আমার বন্ধু হতে পার। বন্ধু খাবারে ভাগ বসাতে পারে। তুমি তো বাপু তা-ও কর না। তুমি খাও উচ্ছিষ্ট। এখন থেকে একটুখানি তোমার জন্য রেখে দেব।’

‘আমার মতো এত ক্ষুদ্র একটা প্রাণীকে বন্ধু বলে গ্রহণ করতে চাইছেন বলে আপনাকে ধন্যবাদ হুজুর।’

‘হুজুর? তুমি তো বাপু সাংঘাতিক কলোনিয়াল মাইন্ডের লোক হে!’

‘লোক নই, লোক নই ডাই রট্টিন। র‍্যাট র‍্যাট গন্ধ পাচ্ছি শব্দটাতে। রট্টিন মানে কি ইঁদুর?’

‘ইয়েস, জর্মন ভাষায়। জানলাম কী করে? ও নামে গুন্টার গ্রাসের একটা উপন্যাস আছে— ডাই রট্টিন। ইংরেজিতে যার নাম দ্য র‍্যাট। ১৯৮৬ তে প্রকাশিত। শোন, ইঁদুর হও আর যা-ই হও, বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করতে না পারলে কথা বলো না আমার সঙ্গে। এমনিতে মনটা ভাল নেই।’

ইঁদুর বলল, ‘মন ভালো নেই তা না হয় বুঝলাম; কিন্তু এই মাঝরাতে মৃত সঞ্জিবনীর বোতল নিয়ে বসেছেন কেনো? এসব তো প্রসূতি নারীরা পান করে স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনার জন্য।’

রবিন বলল, ‘আমি পান করছি নেশায় বুঁদ হতে। এই পানীয়টাতে অ্যালকোহল থাকে বিস্তর। অন্য কোনো মদ কেনার মতো পয়সা ছিল না পকেটে— এই ধরো বাংলা, কেরু কিংবা বিদেশি।’

‘তা বন্ধু নেশায় বুঁদ হাওয়ার কী দরকার তোমার? তুমি কি হটকারী প্রেমিক দেবদাস হতে চাও? মনের দুঃখ ভুলতে মদ্য পানীয়র একটা বিকল্প নিয়ে বসে গেছ? আমি তো জানি তোমার কাল রাতের ব্যাপার। ওই যে তারকোভস্কির মিরর ছবির নায়িকা মার্গারিটা তেরিকোভার মতো দেখতে মেয়েটা, পিকনিক থেকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ঠোঁটের ওপরকার ঘাম মুছিয়ে দিতে গেলে বলেছিল : ধ্যাত্, সময় নেই অসময় নেই শুধু বিরক্ত।

‘তুমি কিছু না বলে চলে এলে। তোমার চরিত্রের সংযম আর পরিমিতি বোধের পরিচয় পেলাম ওখানে। মেয়েটাকে তুমি প্রশ্নবাণে জর্জরিত করনি। আজ সারাদিন অনুসন্ধান করে দেখলে তুমি হচ্ছো মেয়েটার চতুর্থ প্রেমিক। এখন তোমাকে ছেড়ে পঞ্চম প্রেমিক ধরেছে। তার সঙ্গে ইলোপ করবার মতলব আটছে। লোকটা ইঞ্জিনিয়ার। তুমি বেকার ও ছাত্র...।’

ইঁদুরের গলায় গভীর বন্ধুত্বের সহানুভূতি আর আন্তরিকতার আভাস। ইঁদুরের কথা শুনে চমকে ওঠে রবিন। ‘তুমি কি গোয়েন্দা নাকি হে বন্ধু? এ সব তো আমার ঘনিষ্ঠ জনেরাও জানে না। এত চাতুরি, এত বুদ্ধি কোথায় পেলে হে ডাই রট্টিন?’

‘আমি তো ঈশপের গল্পের সেই ইঁদুরটার বংশধর। মাথা ভর্তি বুদ্ধি।’

‘কোন ইঁদুর?’

‘কেনো ঈশপের সেই গল্পটা পড়নি? বলবান আর দুর্বলের গল্প!’

‘মনে নেই। বল দেখি।’

ইঁদুর তখন এক ধাপ নেমে রবিনের চিলে কোঠার জানালার ওপর আরাম করে বসল, তারপর বলল, ‘একদা একটা নেংটি ইঁদুর তাড়াহুড়ো করে ছুটতে গিয়ে ঘুমন্ত এক সিংহের গায়ের ওপর পড়ে গেল। বনের রাজা সবে ঘুমিয়েছিল। কাচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় মহা বিরক্ত হলো সে। থাবড়া মেরে ধরে ফেলল ইঁদুরটাকে। ইচ্ছে তখনই ব্যাটার ভবলীলা সাঙ্গ করে দেবে।

‘বিপদ টের পেয়ে ইঁদুরটা কান্নাকাটি জুড়ে দিয়ে বলল, মহা ভুল হয়ে গেছে প্রভূ। মাফ করে দিন এ বারের মতো। একদিন প্রতিদানে আমিও আপনার জন্য কিছু করবার চেষ্টা নেব। এ কথা শুনে বনের রাজা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। দিলে দয়া হল তার। ইঁদুরটাকে ছেড়ে দিল।

‘তারপর বেশ কিছু দিন কেটে গেল। একদল শিকারী বনে ফাঁদ পেতেছিল শিকার ধরার জন্য। সিংহ সেই ফাঁদে আটকা পড়ল। অনেক চেষ্টা করেও ফাঁদ থেকে বেরুতে পারল না। জীবনের আশা ছেড়ে দিয়ে গর্জন করতে লাগল। সেই গর্জনে আকাশ বাতাস মুখরিত হলো। ভয়ে পালাতে লাগল বনের সমস্ত প্রাণী। সিংহের গর্জন গিয়ে পৌঁছুল নেংটি ইঁদুরের কানে। সে দ্রুত ছুটে গেল সেইখানে যেখানে সিংহটা ফাঁদে আটকা পড়েছিল। কোনো কথা না বলে ইঁদুর তার ছোট ছোট দাঁত দিয়ে কুটুস কুটুস করে ফাঁদের সূতাগুলো কেটে দিল। বলল, প্রভূ এবার নিশ্চিন্তে বেড়িয়ে আসুন। সেদিন আমার কথা শুনে হেসেছিলেন; কিন্তু ক্ষুদ্র ও দুর্বল হলেও আমি আজ আপনার জন্য কিছু করতে পারলাম!’

‘তার মানে তুমি আজ এই বিপন্ন মানব সন্তানের জন্য কিছু করতে চাও? এই মওকায় এক মহান কবির একটা কবিতা তোমাকে উৎসর্গ করতে চাই। তোমাদের নিয়েই লেখা:

যে ক্ষুদ্র ইঁদুরটি শিকারীর জাল কেটে সিংহকে মুক্ত করেছিল

ঈসপের গল্পে, তার সন্ধানের জন্য আমাদের গ্রিসদেশে

যাওয়া আবশ্যক কিনা জানি না, তবে শ্রী ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা

অনূদিত কথামালার ইঁদুরটিকে সংস্কৃত কলেজের ধারে

কাছে পেয়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল, এ জন্য অবশ্য তাকে সংগ্রহ

করতে হবে সেই জলযানটি, যেটি তাকে পৌঁছে দেবে ১৮৫৮-র

পূর্ববর্তী কোনো ক্যালেন্ডারে, ইঁদুর বিষয়ক রচনায় ঈসপ এবং

ঈশ্বরচন্দ্র, দুজন মহামানব এসে পড়েছেন, তাদের আপ্যায়নে

যেন ত্রুটি না থাকে, আমপোড়ার সরবত দিও, সঙ্গে

অবশ্যই বাগবাজারের রসগোল্লা, তোমাদের ওপর এই দায়িত্ব

দিয়ে আমি ইঁদুর বিষয়ক গুটিকয় তথ্য পেশ করি: ইঁদুরেরা

গৃহপালিত না হলেও গৃহে বাস পছন্দ করে, কারণ যে কোনো

গৃহেই গৃহকোণ থাকে, সে গৃহকোণে এক সময় গ্রামোফোন

থাকতো, এখন গ্রামোফোনের বদলে অনায়াসে ইঁদুর ঢুকে যেতে

পারে, আবার গৃহকোণ মানেই এক ধরণের নিরাপত্তা, হেলমেট-

টি কোথায় রেখেছো, এসো আমরা সেই অপ্রচলিত ভাদুগানের

দিকে এগিয়ে যাই, সেখানে হয়ত বা লুকিয়ে আছে ঈসপের ইঁদুরটি,

কে জানে!

এই কবিতার কবির নাম প্রভাত চৌধুরী।’

ইঁদুর বলল, ‘এ এক বিচিত্র উপহার বন্ধু! এ ধরণের উপহার পাবার সৌভাগ্য আগে কখনো হয়নি। তা প্রভাত বাবু সম্পর্কে কিছু বল।’

‘তার সম্পর্কে সামান্যই জানি। “নোটবই” নামে তার একটিমাত্র কাব্যগ্রন্থ পড়বার সৌভাগ্য হয়েছে। ওখানে শরীরবিদ্যা, অংক, বাদ্যযন্ত্র, ভূগোল, পাখি, পোকামাকড়, সমুদ্র, সকাল, শীত, ঘুম, স্মৃতি, কুয়াশা, রাস্তা, পুকুর, লটারি, প্রতিভা আর প্রাণী বিষয়ে কবিতা আছে। তিনি ১১টি কাব্যগ্রন্থ, ২টি প্রবন্ধ আর ২টি উপন্যাস রচনা করেছেন বলে জানা যায়।

‘হাংরি জেনারেশনের প্রতিষ্ঠাতা কবি মলয় রায়চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করব তার কথা। প্রভাত তার বন্ধু মানুষ। নোটবই কাব্যটি মলয় রায়চৌধুরী ও সলিলা রায়চৌধুরাণীকে উৎসর্গ করা হয়েছে। মলয় বাবুর সঙ্গে আমার ফেসবুক বন্ধুত্ব আছে। তা মানব সন্তানটির জন্য কিছু করতে চেয়েছিলে?’

‘ও, প্রেম বিষয়ে তোমাকে কিছু পরামর্শ দেব। সম্প্রতি মানুষের প্রেম-ভালবাসা বিষয়ে এই অধম কিঞ্চিৎ জ্ঞান আহরণ করেছে। এই যেমন ধর— প্রেম দেহের নয়, মনের ব্যাপার। সেক্স ইজ দ্য কনসোলেশন য়ু হ্যাভ হোয়েন ইউ কান্ট হ্যাভ লাভ। এ কথাটা অবশ্য তোমার প্রিয় লেখক মার্কেসের। কিংবা ধর— প্রেম আত্ম আবিষ্কারের একটা পথ। এখন নিজেকে আবিষ্কার করার সময় এসেছে; কিন্তু তুমি তো এখন তোমাতে নেই।’

রবিন একটা বড় আকারের পেগ ঢেলে ইঁদুরের দিকে তাকাল। চোখে তার ঘুম নেমে আসছে। কথা যাচ্ছে জড়িয়ে। ভাঙাচোরা একটা টেপরেকোর্ডার আছে তার। সেটাতে একটা ক্যাসেট ঢুকিয়ে চালিয়ে দিলে বাজতে লাগল ক্ষীণ স্বরে— যে ছিল আমার স্বপনচারিণী...

ইঁদুরের কথা তার কানে ঢুকলো বলে মনে হলো না। ইঁদুর নাছোড় হয়ে বলল, ‘আমার কথা না শুনলে তো কিছু করতে পারব না তোমার জন্য।’

‘বলো ও ও ও ও...শুনছি ই ই ই ই...।’

‘তুমি যে মেয়েটার পঞ্চম প্রেমিক ছিলে তাকে ভুলে যাও, কারণ কখনো-কখনো অতীতের অনেক মানুষকে ভুলে যেতে হয়। কেনো? খুব সোজা— তোমার ভবিষ্যত জীবনে ওই মেয়েটার কোনো ভূমিকা নেই। জানি তোমার হৃদয় বিদীর্ণ হচ্ছে; কিন্তু করবার নেই কিছুই। যে তোমাকে ভালোবাসে না তাকে না পাওয়া আসলে একটা প্রাপ্তি।’

রবিন ঝাঁকুনি খেল একটুখানি, তারপর বিছানায় ঢলে পড়ল। যে তক্তপোষটায় শুয়েছিল তা একবার ডান দিকে একবার বামদিকে ঘুড়ল, তারপর তা ক্রমাগত ঘুরতে লাগল চক্রাকারে। প্রথমে ধীরে-ধীরে তারপর একটুখানি জোরে, শেষে দ্রুত গতিতে বন-বন করে। তার মাথায় ঘুরে-ফিরে আসছিল ইঁদুর বর্ণিত একটা লাইন— যে তোমাকে ভালোবাসে না, তাকে হারানো একটা প্রাপ্তি।

রবিন বিছানা থেকে উঠে ইঁদুরটাকে বলতে চাইল— তুমি ঠিকই বলেছ ডাই রট্টিন; কিন্তু পারলো না। এলকোহল তাকে পুরোপুরি গ্রাস করেছে। তার চোখ মুদে এল। শরীর হলো নিথর। বৈদ্যুতিক পাখাটা থেমে গেছে পাওয়ার ফেইলিয়রের কারণে। ঘেমে নেয়ে উঠেছে সে।  

তারপর সুলতানা পারভীনকে দেখতে পেল একটা বিশাল ঘরে। পাক্কা তিন বছর তার নিষ্ঠ প্রেমিকার ভূমিকায় অভিনয় করেছে একদিনও বেইলি রোডে না গিয়ে। নাচের আসর চলছিল হল ঘরটাতে। হাজার রকমের বাদ্য বাজছিল। হৃদযন্ত্রে কাঁপন লাগিয়ে বাজছিল ড্রাম। মনে হচ্ছিল কানের পর্দা ফেটে যাবে।

চার জন পুরুষের সঙ্গে নাচছিল পারভীন। পরণের ফিনফিনে শাড়ি উড়ছিল বাতাসে। আঁচল খসে খসে পড়ছিল। একটু পড়ে ঝড়ের বেগে বাতাস বইতে লাগল; বাড়তে লাগল বাজনার শব্দ। নর্তকগণ আর একমাত্র নর্তকী উদ্দাম হয়ে উঠেছিল। তাদের শরীর থেকে সব কাপড় উধাও হয়েছে। হঠাৎ সুলতানা পারভীন খিল খিল করে হেসে উঠে। তার হাসির কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। হাসতে থাকে তরুণ, স্বপন, ঝলক আর অলক। তার চার প্রেমিক। নাকি প্রেমিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল তারা? কে জানে!

সুলতানা পারভীনের হাসির মাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে। আগুন ঝরে পড়ে তার হাসিতে। পুড়ে যেতে চায় চার প্রেমিকের শরীর। নাচ থেমে যায় এক সময়। সুলতানা তার সর্বশেষ প্রেমিক অলকের কোলে ঢলে পড়ে। তা দেখে চিৎকার উঠে তরুণ— ‘এই আমার কাছে এসো, ওর সঙ্গে কিসের এত মাখামাখি।’ হুঙ্কার দিয়ে ওঠে স্বপন— ‘না, তুমি ওর কাছে যাবে না, তুমি আমার কাছে এসো, আমার বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হও।’ ঝলক ছুটে আসে এসব দেখে। সে-ও কলরব তোলে— ‘না, ওদের কারও কাছেই যেতে পারবে না তুমি। তুমি শুধুই আমার।’ একথা বলে সুলতানাকে জড়িয়ে ধরতে চায়। অন্য প্রেমিকারা ছুটে এসে বাধা দেয় তাকে। তুমুল মারামারি বেধে যায়। এ সব দেখে হাসিতে ফেটে পড়ে সুলতানা। ছিরিহীন হাসি। কুৎসিৎ। তাকে ডাইনির মতো লাগে।

সে চিৎকার করে রবিনকে ডাকে, ‘রবিন কোথায় তুমি? এ দিকে এসো, এই শয়তানগুলোর হাত থেকে বাঁচাও আমাকে।’ আকাশ বাতাস মাটি কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠে রবিন, ‘সুলতানা, মানুষ নও তুমি, তুমি একটা ডাইনি, ডাইবাক, পেত্নী, পিশাচিনী। কোনো সম্পর্ক নেই তোমার সঙ্গে, কারণ মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক থাকে শয়তানের সঙ্গে নয়, আচ্ছা শয়তানের কি স্ত্রী লিঙ্গ হয়?’

রবিনের ঘুম ভেঙে যায়। ভোর হয়ে গেছে। জানালা দিয়ে ঝির ঝির করে ঠাণ্ডা বাতাস আসছে। চোখ পিট-পিট করে তাকায় সে। টেবিলের ওপর দিয়ে ঘুর ঘুর করছে কাল রাতের সেই ইঁদুরটা।

রবিন বলল, ‘জান, ডাই রট্টিন, কাল রাতে না ভয়াবহ একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি...’

ইঁদুরটা কোনো সাড়া দেয় না। টেবিলের ওপর খাবারের সন্ধান করছে। কিন্তু খাবার সে পাবে কোথায়? বাসি পাউরুটির যে কণাগুলো পড়েছিল প্লেটের ওপর তেলাপোকারা সব চেটেপুটে খেয়ে গেছে।

রবিন বলল, ‘খুব ভয়ঙ্কর ছিল স্বপ্নটা। সুলতানার গায়ে কোনো কাপড় ছিল না। উলঙ্গ ছিল ওর প্রেমিকরাও। উদ্দাম নৃত্য করছিল। শেষে কী প্রচণ্ড মারামারি ওর প্রেমিকদের মধ্যে...’

তারপরও ইঁদুর কিছু বলে না। টেবিলের চারপাশ দিয়ে একটা চক্কর মারে তারপর চিঁ চিঁ করে ওঠে। রবিন প্রায় ধমকে ওঠে, ‘অ্যাই কথা বলছ না কেনো, কাল রাতে তো কত্ত জ্ঞান দিলে?’

বিছানা থেকে উঠে পড়ে রবিন। খুব বাজে ধরণের হ্যাংওভার হয়েছে তার। পানির পিপাসায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে। জগ খোঁজে। একদম খালি। ট্যাপ থেকে পানি ভরে আনে। একবারে কয়েক গ্লাস পানি খায়। ধীরে ধীরে খোঁয়ারি ভাঙ্গতে থাকে। ততক্ষণে ইঁদুরটা চলে গেছে।

রোদ উঠেছে। আলোর বন্যা বইছে চারদিকে। রবিন সিদ্ধান্ত নেয়, গোসল-টোসল করে শাহবাগের দিকে যাবে। খাবার দাবার  রেস্তোরাঁ থেকে পরোটা-মাংস দিয়ে নাশতা করবে। তারপর ট্যুশানির পাওনা আদায় করতে ছাত্রের বাসায় যাবে পরীবাগে। ওখান থেকে ভার্সিটিতে। আসন্ন পরীক্ষার জন্য নোট জোগাড় করতে হবে।

সারাদিনের একটা কর্ম পরিকল্পনাও তৈরি করে ফেলল সে; কিন্তু সেখানে কোথাও সুলতানা পারভীন বলে কেউ এলো না, একবারও না।

 

অলঙ্করণ : মোস্তাফিজ কারিগর

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।