বিকাল ০৪:৩৯ ; শুক্রবার ;  ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮  

বাজেট উচ্চাবিলাসী নয়, রাজস্ব লক্ষ্য অর্জনে শঙ্কা সিপিডির

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট।।

বাজেটের আকার ও ব্যয় নিয়ে দ্বিমত নেই। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, এ বিষয়েও কোনো দ্বিমত নেই। দ্বিমত রাজস্ব আয়, ঘাটতি অর্থায়নের উৎস এবং এর ব্যবহার নিয়ে।

রাজধানীর মহাখালীতে আজ শুক্রবার ব্র্যাক ইন সেন্টারে বাজেট পরবর্তী পর্যালোচনা সিপিডির বিশেষ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ অভিমত ব্যক্ত করেন। সিপিডির পক্ষে তিনি পর্যালোচনা পাঠ করেন। স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সন্দিহান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সিপিডি আশঙ্কা করছে, বাজেটে রাজস্ব আদায়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বড় একটা অংশ অর্জিত হবে না।

ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়া বিষয়ে সিপিডি মনে করে, যদিও এর মাধ্যমে করা সরকারি ব্যয়ে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। তবে ঋণের সুদ পরিশোধে ওই সকল কর্মীর সন্তানদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বাজেট কমে যাবে। ড. দেবপ্রিয় বিষয়টিকে 'লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়' বলে অভিহিত করেন।

উল্লেখ্য, প্রস্তাবিত ২০১৫-১৬ বাজেটে আয় দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা আর ব্যয় দুই লাখ ১৪ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা৭ শতাংশ। রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে ৩০ দশমিক ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ, এ খাতে আদায় বাড়াতে ৪৫,০৭২ কোটি টাকা।

বিনিয়োগ বিষয়ে সিপিডি মনে করে, উন্নয়নের চেয়ে অনুন্নয়নে ব্যয় বেশি। এ ক্ষেত্রে আগামী অর্থ বছরে বৈদেশিক অর্থ ব্যবহার করতে হবে ৫ বিলিয়ন ডলার। আর তা না পারলে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ব্যয় বাড়বে।

এ বিষয়ে সিপিডি আরও জানায়, ব্যাংকিং উৎস থেকে সরকারি ব্যয় বাড়ায় ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের জন্য অর্থের যোগান কমবে। এ ক্ষেত্রে স্বল্প সুদ ও দীর্ঘ মেয়াদি বৈদেশিক ঋণ নেওয়া যেতে পারে। তবে এ অর্থ ব্যবহার এবং তা থেকে ফলাফল পাওয়ার সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।

বিনিয়োগ বাড়াতে সংস্কার জরুরি উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, “বৈশ্বিক ও দেশিয় অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান সময়টি ছিল সংস্কারে জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগি। আমরা সেটা আশা করেছিলাম। কিন্তু তা হয়নি। এ ছাড়া, সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক স্থিতিশীল ও ঐকমত্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

বাজেটের বিভিন্ন খাতে পাঁচটি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছে সিপিডি। এগুলো হলো, পরিসংখ্যান, স্থানীয় সরকার, কৃষি, স্থানীয় সরকার ব্যয় এবং ব্যাংক সংস্কার। বাজেটে ব্যাংক সংস্কার কমিশন উদ্যোগের বিষয়ে সিপিডি খুশি বলে অভিমত ব্যক্ত করেছে। তাদের আশা ক্রমান্বয়ে অন্যান্যগুলোর বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাজেট বরাদ্দ বিষয়ে সিডিপি মত হচ্ছে, জনপ্রশাসন খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের কারণ পে-স্কেল বাস্তবায়ন। পাশাপাশি গত বারের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে এবারও ৫ হাজার কোটি টাকা মূলধন হিসেবে যোগান দেওয়া হবে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং সংস্কার না করে দেওয়া এ বরাদ্দ অন্ধগলিতে হারিয়ে যাবে।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বিষয়ে সিপিডি বলছে, প্রস্তাবিত বাজেটে প্রকল্পের সংখ্যা কমেছে, বিষয়টি ইতিবাচক। তবে প্রকল্পের গুণগত মানে পরিবর্তন হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না দেওয়া, কিছু বরাদ্দ দিয়ে চালু রাখা ইত্যাদি।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা বিষয়ে ড. দেবপ্রিয় ভট্টচার্য বলেন, “বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর আরোপ কিংবা উঠিয়ে নেওয়ার ফলে কোন খাত থেকে কত আয় বাড়বে কিংবা কমবে, সে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। ৯০ দশকের অর্থমন্ত্রীদের বাজেট বক্তব্যে বিষয়টি পাওয়া যেত, এখন পাইনা।”

তিনি আরও বলেন, “বাজেট বক্তব্যে আগের অর্থ বছরের অর্জনে বিষয়ে বিস্তারিত থাকে না। নতুন বাজেটের প্রস্তাবের সময় আগের অর্থ বছরের অর্জনের তুলনামূলক পর্যালোচনা থাকা প্রয়োজন।”

২০৪১ নাগাদ বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের তালিকায় উঠে আসবে, এ বিষয়ে করা বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “উন্নত বিশ্ব হতে হলে মাথাপিছু অায় বর্তমান হিসাবে ১২ হাজার ডলার হতে হবে। এর জন্য আমাদের লক্ষ্য ছিল ২০২০ সাল নাগাদ জিডিপি ১০ শতাংশে উন্নীত করা। এক প্রজন্মে মাথাপিছু আয় ৮ গুণ বাড়ানো। সেখানে জিডিপি ঘুরেফিরে ৬ শতাংশের ঘরে রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “আগে মধ্যম আয়ের দেশ তারপর উন্নত দেশ। এ জন্য মাথাপিছু আয় ৪ হাজার ডলার হতে হবে। জিডিপি'র গতি ত্বরান্বিত করতে হবে। ২০৪১ সালে উন্নত দেশ হওয়া দূরহ, তবে সম্ভব।”

অাঞ্চলিক যোগাযোগ ও ট্রানজিট মাশুল বিষয়ে করা একটি প্রশ্নের জবাবে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “সিপিডি মনে করে, আঞ্চলিক সহযোহিতা হতে হবে 'উইন-উইন'। টানজিট মাশুলের তুলনায় সার্ভিস চার্জ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভারত এতে অাগ্রহী। তবে মাশুল নেওয়া বিষয়ে (ভারতে কাছ থেকে) দেশের অতি উৎসাহী কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে বাজে ও আপত্তিকর মন্তব্য করছেন। তা আপনারা জানেন।”

এ বিষয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, “আমরা দেখে আসছি, অাঞ্চলিক যোগাযোগ কখনো দ্বি-পাক্ষিক, কখনো ত্রি-পাক্ষিক, এবং কখনো স্থল, কখনো নৌ, এবং অন্যান্য। তবে এ যোগাযোগ সার্বিকভাবে গড়া উচিত। আর এ জন্য বড় ধরনে বিনিয়োগ প্রয়োজন।”

ভারতের ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, “প্রথম কিস্তির ঋণে শুধু রেল ওয়াগন ও বাস কেনা হয়েছে। অপর প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়।”

তিনি আরও বলেন, “প্রথম কিস্তির ঋণের শর্ত ছিল আমদানি করতে হবে ভারত থেকে। দেশটির দেওয়া ঋণের পরিমাণ যা হোক না কেন, তা হতে হবে আমদানি উৎসের শর্ত ছাড়া।”

এবারের বাজেটের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও ভালো দিক কোনটি এমন প্রশ্নের জবাবে ড. দেবপ্রিয় বলেন, শিশু বাজেট সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক। আর ঘোষণা ছাড়া জেলা বাজেট বাদ দেওয়া হলো সবচেয়ে অনুজ্জ্বল দিক।

গতকাল জাতীয় বাজেট ২০১৫-১৬ ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় বাজেটের পরদিনই সিপিডি আজ তাঁদের পর্যালোচনা জানাল।

সার্বিকভাবে সিপিডি মনে করে, বাজেটে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দেখানো ‘প্রবৃদ্ধির সোপানে আরোহণের’ স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন। এ 'সোপানের পথ' পিচ্ছিল হয়ে উঠতে পারে। সোপানের পথটি মসৃণ করতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।

/এফএইচ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।