বিকাল ০৫:১৪ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৩ মে, ২০১৯  

একজন শান্তিরক্ষীর ডায়েরির পাতা থেকে....

প্রকাশিত:

সম্পাদিত:

মেজর সাইফুল ইসলাম (অব.)।।

‘একজন সেনার দায়িত্ব যুদ্ধ করা নয় যুদ্ধ থামানো’। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে আমরা তাই করেছি, শান্তিরক্ষীরা তাই করে। এখানে আমাদের অনেক অহংকার লুকিয়ে আছে। সেই অহংকারের আমিও একজন গর্বিত অংশীদার। গত সপ্তাহে চলে গেল, আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস। এই দিনকে লক্ষ্য রেখেই আমার সিয়েরা লিয়নের সময়গুলোর একটি অংশ তুলে ধরলাম।

জানুয়ারি,২০০৩, স্থান: হেস্টিংস, সিয়েরা লিয়ন।

যুদ্ধ শেষ। বাতাসে বারূদের গন্ধ মিলিয়ে শান্তির সুবাস বইতে শুরু করেছে এখানে। সীমান্তবর্তী দেশ লাইবেরিয়ার রিফুজি ক্যাম্প থেকে বাস্তুহারারা ফিরতে শুরু করেছে। আমার ক্যাম্প এ কাজ করতে আসে মোহাম্মেদ। তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আওয়া ও ছয়টি শিশু বাচ্চা নিয়ে দু'সপ্তাহ আগে লাইবেরিয়া থেকে ফিরে এসেছে। গাছের ডাল কেটে ঘর করেছে রকেল নদী আর আটলান্টিক এর মোহনায় পাহাড়ের ঢালে। বাচ্চাদের প্রায় সবাই আওয়ার গর্ভের যুদ্ধশিশু।

শয়নে,স্বপনে,চলাচলে,নিঃশ্বাসে -সব ক্ষেত্রে শান্তি এলেও পেটের শান্তি পর্যাপ্ত ছিলনা। মোহাম্মেদ আর আওয়াদের খাবার বলতে ছিল জংলি শিকার আর কাসাবা পাতা। ওরা সাধারণত দিনে একবেলা খায়।

তিনদিন ধরে একটানা মূষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। রকেল নদী ফুলে ফেপে একাকার। আমার ক্যাম্প থেকে যে সরু মাটির রাস্তাটি পাহাড়ী জংগলের ভিতর দিয়ে দেড় কিলোমিটার দূরে মোহাম্মেদদের ঘর পর্যন্ত মিলেছে তার পুরোটাই কাদাপানিতে ডুবে আছে। সেই কাদাপানি আমার মনের ভিতরেও বাসা বেঁধে আছে ছয়টি বাচ্চা আর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীসহ মোহাম্মেদের পরিবারের কথা ভেবে।

মাটি আর গাছের ডালে সদ্য নির্মিত ঘরটি ঠিক আছে তো?ওরা তিনদিন ধরে কি খাচ্ছে? আমার ভাবনার সঙ্গে যোগ দিলেন আমার ক্যাম্প জেসিও,রানার এবং ড্রাইভার।

জীপ ভর্তি খাবার লোড হলো। ড্রাইভার চার বাই চার গিয়ারে ইউক্রেনিয়ান ব্যাটালিয়নের ভেতর দিয়ে কাদা রাস্তাটি পেরিয়ে মোহাম্মেদদের ঘরের কাছে নিয়ে যেতে সক্ষম হলো।

ওদের আঙিনায় হাটু কাদা আর জংলি খুটি। তখনও বৃষ্টি থামেনি। ঘরের ভেতর থেকে মোহাম্মেদ পরিবারের সবাই আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে এক দৌড়ে আঙিনায় বেরিয়ে এলো। পরের দৃশ্য বর্ণনায় বোঝানো কঠিন!

ওরা সবাই কাদার মধ্যেই হাটু গেড়ে বসলো,একবারে সেজদার মতো করে মাটিতে কপাল ছুইয়ে,হাতসহ মাথা আকাশের দিকে মেলে সুরাহ ফাতিহা পড়ে মোনাজাত করলো। ততক্ষণে গাড়ি  থেকে ওদের জন্যে খাবার নামানো হয়েছে।

আওয়া আবেগাপ্লুত হয়ে আমার কনুই পর্যন্ত ধরে রেখে বিলাপ করছে... "মেজর,ইউ আর এন এনজেল! ইউ মাস্ট হ্যাভ বিন সেন্ট বাই গড। উই আর ডায়িং।

ওদের কাছেই শুনতে পেলাম, গত তিনদিনে ওরা বৃষ্টির পানি ছাড়া আর কিছু খায়নি। সেদিন ওদের মুখে হাসি দেখিনি। সম্ভবত হাসার মতো শক্তি ছিলনা বলে। তবে,ওদের চোখে মুখে -শান্তি দেখেছি, স্বস্তি দেখেছি, দেখেছি পরিত্রাণের জ্বলজ্বলে আভা।

মার্চ,২০০৩

আমি দুই মাসের মতো মাসাম্বি ক্যাম্পে থাকার পর আবার হেস্টিংস এ ফিরে এসেছি। আওয়া আমাকে দূর থেকে দেখে আনন্দে আত্মহারা। ক্রিও ভাষায় বললো, ‘মেজর তুমি কোথায় ছিলে, প্রতিদিন এসেছি এবং তোমাকে খুঁজেছি।’

বিকেলে মোহাম্মেদ ও আওয়া আমার ক্যাম্পে এলো সঙ্গে সাত বাচ্চা। এর আগে যাকে পেটে দেখেছিলাম আজ সে আওয়ার পিঠে। গামছার মতো একটা কাপড়ে বাধা দুই সপ্তাহের ছেলে।

সবার চোখে মুখে কী আনন্দ! আমারও খুব আনন্দ হলো যখন আওয়া জানালো, তার ছেলের নাম রেখেছে ‘সাইফ’  আমার নামে নাম।

প্রিয় জাতিসংঘ,

তুমি কি জানো? আমরা বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীরা তোমার বেধে দেওয়া রাজনৈতিক আর ভৌগলিক পরিসীমা পেরিয়ে মানুষের মন পর্যন্ত পৌঁছে কিভাবে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির বীজ বপন করে আসি? আর তাই ওরা আমাদের ভাষা শিখে,আমাদের নামে রাস্তা ও বাচ্চাদের নাম রাখে...

প্রিয় নোবেল শান্তি পুরস্কার জাজেস প্যানেল,

তোমরা কি জানো বাংলাদেশের লাখ লাখ শান্তিরক্ষী যুগে যুগে বিশ্বময় কত কোটি পরিবারে শান্তি এনেছে? একবারও কি ভেবেছ, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে শান্তিতে নোবেল দেওয়ার কথা?

প্রিয় বাংলাদেশ,

তুমি নিশ্চয় জানো, একজন শান্তিরক্ষীর জীবন কেমন? তোমার বৈদেশিক মূদ্রার কতভাগ শান্তিরক্ষীদের দ্বারা অর্জিত? শান্তিরক্ষী দিবসে -পৃথিবীর তাবৎ শান্তিরক্ষীদের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা ও শুভ কামনা।

/এফএএন/ 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।