দুপুর ০৩:০৮ ; বৃহস্পতিবার ;  ২৭ জুন, ২০১৯  

আবীরের ক্যামেরায় বিধ্বস্ত নেপাল

প্রকাশিত:

এহতেশাম ইমাম

প্রকৃতির কাছে মানুষের অসহায়ত্বের বিবরণে সম্প্রতি যোগ হয়েছে নেপালের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের ঘটনা। সারাবিশ্বের গণমাধ্যমে একে দুর্যোগ আর মানুষের অসহাত্ব বলে প্রচার করলেও, কোনও কোনও গণমাধ্যম কর্মী বিষয়টিকে দেখেছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। যেখানে তারা স্থানীয় নেপালিদের মুঝে খুঁজে পেয়েছেন মৃত্যুকে জয় করার এক অদম্য শক্তি। সেই গণমাধ্যম কর্মীদের একজন বাংলাদেশের স্থিরচিত্র শিল্পী আবীর আবদুল্লাহ। যিনি ক্যামেরায় ধারণ করেছেন নেপালিদের জীবন চেতনা থেকে শুরু কের দুর্যোগ পরবর্তী সংগ্রমাকে।

নেপালে ভূমিকম্পের পর থেকে টানা ছয়দিন তিনি ছবি তুলেছেন দেশটির বিভিন্ন স্থানের। আর সেসব ফ্রেমবন্দী মুহূর্ত নিয়ে আয়োজন করেছেন ‘নেপাল-রেসিলেন্স এন্ড রিজনস” নামের প্রদর্শনীর। বাংলা ট্রিবিউনকে একান্ত আলাপচারিতায় আবীর আবদুল্লাহ বলেছেন নেপালের ছবি তোলার অভিজ্ঞতার কথা

 যখন ভূমিকম্প হলো

২৫ এপ্রিল নেপালের সঙ্গে কেঁপে উঠেছিল বাংলাদেশও। ভূমিকম্প হওয়ার পরপরই ফোন পাই আমার বর্তমান কর্মক্ষেত্র ইউরোপিয়ান প্রেস এজেন্সির পক্ষ থেকে। তারা বললেন, নেপাল যেতে হবে। পরদিন কাঠমান্ডু বিমানবন্দরের আকাশে দু’ঘন্টা চক্কর কাটার পর ল্যান্ড করে আমাদের বিমানটি। একই ফ্লাইটে ছিলেন বাংলাদেশ ঘুরতে আসা নেপালি থেকে শুরু করে প্রিন্ট,ইলেকট্রনিক মাধ্যমের প্রায় ১০ সাংবাদকর্মী। মূলত বিমানবন্দর থেকেই শুরু আমাদের ছবি তোলার।

বিধ্বস্ত, নিস্তব্ধ নেপালে

কাঠমান্ডু আসার পরপরই প্রথমে মনে হলো, এ কোথায় এলাম। বিমানবন্দরের ভিতরে কোনও মানুষ নেই। নেই কোনও টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা। বাইরে এসে দেখলাম, দেশে ফিরতে ব্যাকুল হাজারখানেক ভারতীয়। তারা ভিড় করে আছেন বিমানবন্দরে।আমরা বের হয়ে আসি সেখান থেকে।আশপাশ কেমন নীরব।ম‌‌হারাজা হোটেলে রাতের মতো আশ্রয় নিই।পরদিন থেকে শুরু ধংসস্তুপের মাঝেও নেপালিদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম অবলোকন।

সন্তাপের রাত ও সকাল  

রাতেই চোখে পড়ে শবদাহ। আকাশে আলেঅ না থাকলেও চিতার আগুনে লালাভঅ চারপাশে। তখনই খিচু ছবি তুলে রাখি। পরদিন সকালেও দেখতে হলো এই দৃশ্য। তবে এবার সুর্যের আলোয় আগুনের তেজ কম মনে হলো। আমার ছবি তোলার শুরু হলো বিমানবন্দর থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের দূরত্বে রাজস্থান হোটেলের পেছনে পশুপতি সেই শ্মশানকে ঘিরে। হোটেল থেকে দেখি দূরে অসংখ্য শবদেহ পোড়ানো হচ্ছে। হোটল থেকে বেরিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই আমরা শ্মশানে গিয়ে ছবি তুলতে শুরু করি। মনের মেঘ যেন আকাশে গিয়েও জমা হলো সেদিন।বিপর্যস্ত নেপালের করুণ ছবি আমাদেরও সিক্ত করল।

কোথাও যেন মানুষ নেই

প্রথম ভূমিকম্পের পরের ছয়দিন দেশটিতে প্রায় কয়েক  শ’ ভূমিকম্প হয়েছে। প্রায় নির্ঘুম রাত কেটেছে এ কয়দিন। কিছু হলেই মানুষ আতংকে ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসার জন্য চিৎকার করত। ধীর-স্থির, হাসি-খুশি, চেনা মানুষ যেন খুঁজে পাচ্ছিলাম না নেপালে।আমরা রাজধানী কাঠমান্ডুসহ শাকু,ভক্তপুর,ললিটপুরে ঘুরেছি ছবি তুলতে। সবখানে দেখেছি, মানুষ ঘর ছেড়ে উম্মুক্ত স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। মৃতদেহ আর উদ্ধারকর্মী ছাড়া কোথাও আমরা আর মানুষ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। উদ্ধারকর্মীরাও যেন বুঝতে পারছিল না কী খুঁজে বের করবেন তারা। জীবন্ত মানুষ, সম্পদ না লাশ! ধ্বংসস্তুপ আর মৃতদেহের ছবি ছাড়া কিছু সেখানে ছিল না আমাদের জন্য।

নতুন অস্তিত্বের খোঁজে

বাংলাদেশেও ভূমিকম্প হয়েছে। তবে এমন ভয়াবহতা কল্পনাও করতে পারিনি। অথচ তখন তা সারাক্ষণ চোখের সামনে দেখতে হয়েছিল। শুরুতে খারাপ লাগলেও পরিস্থিতি মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। নতুন কোনও কিছুর অস্তিত্ব খুঁজছিলাম। ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়েছিল যে অস্তিত্ব শুরু করলাম তার খোঁজ। ক্যামেরায় তুলে ধরতে চাইলাম সেই হারানো জীবনের গল্প।

সৌম্য নেপাল মন

আমি বিশেষত খেয়াল করেছি, শবদাহের সময় ছাড়া আবেগের বহিঃপ্রকাশ করে না নেপালিরা। অনেক নেপালিকে প্রশ্ন করেছিলাম, এত কিছু হারাবার পরও কাঁদছেন না কেন? একটাই উত্তর দিয়েছিলেন তারা। ‘আমরা অতিথিদের সম্মান করি, তাদের সামনে কাঁদি না।’  মনে হলো নেপালিরা কত শান্ত আর সৌম্য। 

ধংসস্তপে বিয়ের ফুল

ধ্বংস্তুপ আর মৃতদেহের মধ্যে দিন কাটাতে কা‍টাতে যখন প্রায় হাঁপিয়ে উঠেছি, এসময় হঠ্যাৎ কাঠমুন্ডুতে খুঁজে পেলাম একটি বিয়ের আসর। সেই অনুষ্ঠানের একজন বললেন, ‘জীবন কখনও থেমে থাকে না।’ আমার প্রদশর্নীর আয়োজন মূলত এই কথাটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

 

প্রদশর্নীর বিস্তারিত: ৫ জুন বিকাল সাড়ে পাঁচটায় রাজধানীর ধানমন্ডির গ্যালারি চিত্রকে ‘নেপাল-রেসিলেন্স অ্যান্ড রিজন্স’ শিরোনামে ছয় দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর উদ্ধোধন করবেন ক্যামেরার কবি নাসির আলী মামুন, খ্যাতিমান স্থপতি, কবি রবিউল হোসেন ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’র ব্যুরো প্রধান জুলহাস আলম। ১১ জুন পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে প্রদর্শনী।

ছবি: আবীর আবদুল্লাহ।

/এসএস/

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।