সন্ধ্যা ০৭:৩৫ ; বৃহস্পতিবার ;  ১৮ জুলাই, ২০১৯  

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || সপ্তম পর্ব

প্রকাশিত:

পূর্বপ্রকাশের পর

হুমকি-হত্যা-সমুদ্র এই তিনটি শব্দ মাসাধিক সময় ধরে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। যার যার জীবন তার তার মতো করে অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ। জীবনের সবদিক আমার পছন্দ নয়। তাই বলে পৃথিবীতে কোনো কিছুই থেমে নেই, থাকবেও না। জীবনের বহু বহু অন্ধকার দিক এড়াতে এড়াতে; ক্লেদাক্ত বহু কিছু লুকাতে লুকাতে নিষ্ঠুর-নির্মম এমন সব বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে যাই, লজ্জায়-শঙ্কায়, মানবতার চরম অপমান-অসম্মানে নিজেকে লুকানোর এক চিলতে আড়াল খুঁজে পাই না। এতোসব বিভৎসতা; এতোসব লোভের উল্লাস দেখার জন্য পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করতে হবে কেন? মাঝে-মাঝে মনে হয়; অন্তত এই পৃথিবীতে আমি আমার জন্মগ্রহণ নিয়ে ধন্য নই। পৃথিবীর রূপ-রস উপভোগ করেও মনে হয় এতোসব ক্লেদাক্ত বাস্তবতা দেখার জন্য জন্মগ্রহণ করা ঠিক হয়নি। কিন্তুতো এই পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ায় আমার কোনো হাত নেই।
চীনের জীবনে আমার বন্ধুরা আমাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে যে স্থানগুলোতে নিয়ে গিয়েছিলো, তার ৯৯ ভাগ পাহাড়। এভাবেও বলা চলে, চীনের জীবন শুরু হয়েছিলো পাহাড় দিয়ে। চীনে পৌঁছার এক সপ্তাহের মধ্যে আমার বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলো গ্রেট-ওয়াল। পুরোটাই পাহাড়ের গল্প। বেইজিং থেকে চার ঘণ্টার দূরত্বে শিত্যু বলে যে স্থানে গিয়ে আমি আর ফিরে আসবো না বলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলাম, সে স্থানটিও পুরোটাই পাহাড়। আর আমার প্রিয় বন্ধু শিনশিন— হেন ফিয়াও লিয়াঙ, হেন ফিয়াও লিয়াঙ (অপূর্ব সুন্দর, অপূর্ব সুন্দর) করতে করতে আমাকে গ্রেট ওয়ালের যে লেকসাইট দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলো; তাও বস্তুত পাহাড়। এই পাহাড়গুলো বাংলার উর্বরা মাটির নয়। কঠিন পাথরের। আমার বার বার মনে হয়েছে; পাহাড় কই? সবিতো কঠিন শিলার সাম্রাজ্য। এইসব পাহাড়ে পাহাড়ে মিশে আছে কতো কতো হত্যা আর রক্তের ইতিহাস!
বাংলাদেশে ফিরে আসার পর আমি আর পাহাড়ে যাই না। মাঝে-মাঝে অবকাশে সমুদ্রে যাই। জলে ধুয়ে আসি ক্লান্তি। কেউ যদি বলে চলো, সমুদ্রের জলে পাপ ধুয়ে আসি; অসম্মানিত হই। আমিতো কোনো পাপ করিনি! পাপ কাকে বলে? সেই সমুদ্র এবার আমাকে পাপ চেনালো। সেই সমুদ্র এবার আমাকে হত্যার হলি উৎসব চেনালো। মনে হয় সমুদ্রেও আর যাওয়া হবে না। এশিয়া-আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যে, ইউরোপে এক সময় দাস চালান হতো। আবার আরব বিশ্ব কিংবা আফ্রিকা থেকে এশিয়ায়ও দাস আমদানি করা হতো। সেসব বাণিজ্যের অংশ, অর্থের বিনিময়। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে দাসদের কাছ থেকে উল্টো টাকা নিয়ে, কিংবা জিম্মি করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে এবং সমুদ্র থেকে স্থলে নামিয়ে গভীর জঙ্গলে হত্যার হলি উৎসব করে গণকবর, মানে মাটির নিচে পুঁতে ফেলা কোন সভ্যতার কথা বলে? জলে-স্থলে-পাহাড়ে সর্বত্র এতো হত্যা আর রক্তের হলি; কোথায় যাবো; কোথায় লুকাবো? এই যে কথাগুলো লিখছি, কারো পছন্দ হলো না, হুমকি দাও। যুক্তিতে যাবে না, লেখার জবাব লেখায় দেবে না, গুপ্তঘাতক হয়ে পেছন থেকে কুপিয়ে হত্যা করা হবে। ফলে হুমকি-হত্যা-সমুদ্র এই তিনটি শব্দকে এখন আর আমার নিতান্ত শব্দ মনে হয় না। মনে হয় এক একটি আততায়ী।

দুই.

সার্কিট হাউসে

জলে ভাসবো বলেইতো বরিশাল যাওয়া। গভীর রাতে নিকষ অন্ধকারে কিংবা জোস্নায় জলের শরীরে মিশে কথা বলবো বলেইতো বরিশাল যাওয়া। সেই জলে যদি এতো এতো হাহাকার, এতো এতো আর্তনাদ জড়িয়ে থাকে— ও জল; আমি কোথাও যাবো না! প্রিয় বন্ধুদের মুখগুলো যতনে বুকে জড়িয়ে রেখে বরং আরো বেশি একা হয়ে যাবো। সার্কিট হাউসে বস্তুত বিশ্রাম নেওয়া হয় না। শোলক গ্রামের ঘোরও কাটে না। এরই মধ্যে কবি শামীম রেজার হাঁক-ডাকে সবাইকে প্রস্তুত হতে হয়। মুহসিন ভাই রবিশংকর বল আর জহর সেনমজুমদারকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করেছেন। যে সময়টা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। মুহসিন ভাই অপেক্ষা করতে করতে রেজাকে ফোন করেন; আর রেজা তাড়া করেন আমাদের। কোন অলিগলি দিয়ে রেজা আমাদের কোথায় নিয়ে গেছেন জানি না। মনে আছে; একখানে আমাদের যাত্রা বিরতি হলে, মুহসিন ভাইসহ বেশকিছু ছেলেমেয়ে রবিশংকর বল এবং জহর সেনমজুমদারকে গ্রহণ করে নেন। এখানে প্রসঙ্গ ক্রমে একটা কথা বলে রাখি; কথাশিল্পী পারভেজ হোসেনের জন্মস্থানও এই বরিশাল। কিন্তু পুরো যাত্রায় পারভেজ ভাইকে আমার কাছে ম্লান এবং আনমনা মনে হয়েছে। বরিশাল নিয়ে বিশেষ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে তাকে দেখিনি। যে ভবনটার দোতলায় আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো, প্রবেশের মুখে প্রচুর লোকজন বসে ছিলেন। তাদের পার হয়ে ভিতরে ছোট্ট হল রুমের মতো। মূলত পাঠকক্ষ। অর্থাৎ পাঠাগারের পাঠকক্ষ। আমার এমনটাই মনে হয়েছে। কারণ, দুইপাশে আলমেরিতে থরে থরে সাজানো বই। আর কক্ষটি জুড়ে যেভাবে টেবিলপাতা, তাতে ওই কক্ষটিকে বোর্ড মেটিং রুম বলেও ভ্রম হতে পারে।
মুহসিন ভাই জানিয়ে দিলেন, প্রচুর মানুষ এসেছিলেন রবিশংকর বল এবং জহর সেনমজুমদারকে সংবর্ধনা জানাতে। কিন্তু আমরা এতোটাই বিলম্ব করেছি, হতাশ হয়ে তারা চলেও গেছেন। আগেই বলেছি; বরিশাল ছোট্ট এবং শান্ত শহর। সন্ধ্যা নামতেই সুনসান নির্জনতা। কক্ষটিতে ছোট্ট করে অতিথিদের জন্য আসন পাতা হয়েছে। আসনগুলো আলোকিত করলেন জহর সেনমজুমদার, রবিশংকর বল, পারভেজ হোসেন, রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী। আয়োজনটি ছিলো মূলত ‘আড্ডা ধানসিড়ি’ সংগঠনের। চমৎকার উপস্থাপনা করেছিলেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী সিফাত আরা বাঁধন। স্থানীয় এবং আমাদের বহরের কবিরা কবিতা পড়লেন। পরিমিতির একটা সীমা থাকতে হয়। রবিশংকর বল এতো সংক্ষেপে কথা বললেন, রাগ হয়। কিছু জিজ্ঞেস করলেই মৃদু হেসে বলেন, জহর আছে না! ও বলবে। কিন্তু আমরাতো রবিশংকর বলের চিন্তা জগতের কথাগুলো জানতে চাই। যতোই বলেন; সবকিছুতো লেখার মধ্যে বলে দিচ্ছি। আসলেই কি সব কথা লেখায় বলা যায়? 
হঠাৎ রেজা ক্ষেপে গেলেন। যেনতেন ক্ষেপা নয়। রীতিমতো শাসন। অনুষ্ঠান চলার সময় স্থানীয় কবিরা এতোবার কক্ষের ভিতর-বাহির করছিলেন, কিছুতেই কারো বক্তব্য কিংবা কবিতা পাঠে মনোসংযোগ করা যাচ্ছিলো না। মাঝে মাঝে আমি একা থাকলে পাতাপতন কিংবা জলপতনের শব্দেও কেঁপে উঠি। রেজার কথায়ও কেঁপে উঠলাম। অবশ্য রেজার ক্ষেপে যাওয়ায় কাজ হলো। তরুণ তুর্কিরা কিছুটা থিতু হয়ে বসলেন। কবি আসমা চৌধুরী এবং ছড়াকার তপংকর চক্রবর্তী রেজাকে সমর্থনও জানালেন। সেদিনের সেই আয়োজনে যতদূর মনে পড়ে অধ্যাপক রণজিৎ মল্লিক, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শারমিন আক্তার, মোহসিনা হোসাইনও উপস্থিত ছিলেন। আর স্থানীয় কবিদের মধ্যে মাহমুদ মিটুল, মেহদী হাসান, শফিক আমিন, রুমান শরীফ-সহ আরও কবিরা কবিতা পাঠ করেছিলেন।

তিন.

জহর সেনমজুমদার আমার কেউ না। শিক্ষক-বন্ধু-আত্মীয় এর কোনোটাই তিনি আমার নন। বহু বছর ধরে তার গ্রন্থ পড়ে আসছি। যেমন পড়ে আসছি রবিশংকর বলের গ্রন্থ। আমি জানতাম না জহর সেনমজুমদারের পূর্বপুরুষের আদিবাস বরিশাল। একইভাবে রবিশংকর বলের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাসও বরিশালে। এই দুই লেখকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগও নেই। পাঠে এ দুজন আমার আত্মার আত্মীয়। গত কয়েক মাস ধরে রেজা একটু একটু করে জহর সেনমজুমদারের নানান দিক আমাকে অবহিত করতে থাকেন। ফলে আগ্রহটা আস্তে আস্তে প্রলম্বিত হয়। অন্যদিকে শিক্ষকদের সঙ্গে আমার কেনো যেন জমতে চায় না। আমার অনেক বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজে পড়ান। শিক্ষক হওয়ার পর এদের অবস্থা এতো করুণ হয়ে গেছে যে, দেখলেই মনে হয় শতবর্ষ আগের কোনো প্রাচীন রোবটের সঙ্গে এখন আমার আলাপ হবে। আরেকটা সমস্যা, ওই শিক্ষক বন্ধুরা আমাকেও তাদের ছাত্র ভাবতে ভালোবাসেন। এই ভাবাভাবিতে আমার মোটেও আপত্তি নেই। শুধু মনে প্রশ্ন জাগে, শিক্ষক হলেই কি শতবর্ষ আগের প্রাচীন রোবটের মতো কথা বলতে হয়? কিংবা শতবর্ষ আগের প্রাচীন রোবট হয়ে যেতে হয়? এই আশঙ্কটা জহর সেনমজুমদারকে নিয়েও আমার ছিলো। কিন্তু রেজা বার বার আমার ধারণা পাল্টাতে চেষ্টা করেছেন। অপেক্ষায় ছিলাম। প্রথম দেখাতেই আমার তাবৎ ধারণা উধাও হয়ে গেছে। অতি সংক্ষিপ্ত সময়ে তিনি আমার শিক্ষক-বন্ধু-আত্মীয় হয়ে উঠেছেন। কারণ, তিনি শিক্ষক-গবেষক হলেও প্রকৃত অর্থে তিনি একজন জাত কবি। কবি বলেই তাবৎ সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে চুরমার করে দিতে জানেন।

জীবনানন্দ দাশের বাড়ির সামনে কবি শামীম রেজা, হেনরী স্বপন ও কবির হুমায়ূন 

আড্ডা ধানসিড়ির আয়োজনে তাকে কবিতা পাঠের আমন্ত্রণ যখন জানালেন বাঁধন; মিষ্টি করে হাসলেন জহর সেনমজুমদার। ডায়াসের দিকে এগিয়ে গেলেন। মাইক্রোফোনে মুখ ঠেকিয়ে কি কি বললেন মনে নেই। পূর্বপুরুষ শোলক গ্রাম এসব প্রসঙ্গ হবে হয়তো। এসবইতো বলবেন। ৫৫ বছরের জমাট কষ্ট বলবেন নাতো কি বলবেন? বলতে বলতে কি এক মন্ত্রমুগ্ধ পরিবেশ ছড়িয়ে দিলেন কক্ষটিতে, ঠিক বোঝানো যাবে না। যেন হেমিলনের বাঁশিওয়ালা। সেই বাঁশির সুরে আমরা জগৎ-সংসারের কথা ভুলে যেতে বাধ্য হই। আহা বরিশাল! আহা জীবনানন্দ! আহা বরিশালের অসংখ্য অসংখ্য নদ-নদী! আহা বেহুলা! আহা মঙ্গলকাব্য! আহা মনসামঙ্গল! আঁকা-বাঁকা নদীর স্রোতে ভাসাতে ভাসাতে মস্তিষ্কের নিউরনে প্রবেশ করিয়ে দিলেন জীবনানন্দ দাশের কবিতার সাইকো এনাটিক্যাল এ্যাপ্রোচ। কেউ কিছু বোঝার আগেই বলতে বলতে নির্দিষ্টস্থানে যতি টেনে ডায়াস ছেড়ে বসে পড়লেন নির্দিষ্ট আসনে। বিপুল করতালিতে ফেটে পড়লো কক্ষ। এটা কী হলো! এ কোন জাদু দেখালেন অধ্যাপক জহর সেনমজুমদার! ভাবনার অধিক কিছু। অধ্যাপক রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী শামীম রেজাকে ডেকে বললেন, রেজা এই বক্তৃতাতো আমরা হাজার টাকার টিকিট কিনে শুনতে রাজি। ঢাকায় ব্যবস্থা করো। রেজা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেন, হবে; সব হবে। 
সেনমজুমদারের জাদুবাস্তবতা মাথায় নিয়ে আমরা ফিরি ফের সার্কিট হাউসে। কিন্তু চায়ের বড় তেষ্টা পেয়েছে। চায়ের খোঁজে এদিক-ওদিক চলি। পরে চা পেয়ে যাই সার্কিট হাউসের সামনে।চায়ের আড্ডা থেকে সার্কিট হাউসে পৌঁছার পর পরই রবিশংকর বল এবং জহর সেনমজুমদারের কক্ষে একদল ছেলেমেয়ে এসে হাজির। আমি আমার রুমে ছিলাম। জাহিদ সোহাগ ফোনে আমাকে জহরদার রুমে ডেকে নেয়। হেমিলনের বাঁশিওয়ালা বাঁশির সুর ছড়ালে এমনটাই হবে এতো নতুন কিছু না। যারা এলেন, এদের প্রায় সকলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য। অনেকেই লেখক। নানান প্রশ্নে আর উত্তরে জমে উঠে আড্ডা। মধ্যমনি কবি-অধ্যাপক-গবেষক জহর সেনমজুমদার।
অন্য আরেক আড্ডা জমিয়ে তুলেছেন পারভেজ হোসেন এবং রবিশংকর বল-সহ বাকিরা। সেখানেও আমার ডাক পড়ে। কিন্তু ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে আমি কোথাও প্রাণ খুলতে পারছিলাম না। এতো কিছুর মধ্যে আমার বার বার মনে পড়ছিলো কবি হেনরী স্বপনের কথা। তিনি তো আমাদের অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু। বরিশালের বাইরে থেকে কোনো লেখক যদি বরিশাল যায় এবং সেটা যদি হেনরী অবগত হন নিজ উদ্যোগে যাবতীয় দায়িত্ব নিয়ে নেন। আমাদের বহরের জন্য তিনিইতো সার্কিট হাউস ঠিক করেছেন। ভোরে আমাদেরকে গ্রহণ করেছেন। তাহলে তিনি কেনো থাকবেন না শোলক যাত্রায়? তিনি কেনো থাকবেন না আড্ডা ধানসিড়ির আয়োজনে? তিনি কেনো থাকবেন না সার্কিট হাউসের আড্ডায়? এর কিছুদিন আগে রেজার সঙ্গে প্রথম বরিশাল গেলে লঞ্চ থেকে নেমে সোজা হেনরীর বাসায়। সেই কাক ডাকা ভোরে হেনরী এবং হেনরী বৌদি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। চালের রুটির সঙ্গে হাঁসের মাংস দিয়ে চমৎকার সকালের নাস্তা করিয়েছিলেন। হেনরী বৌদিকে সেই প্রথম দেখেই আমার মনে হয়েছে ইনি বৌদি না। ইনি হলেন শ্রদ্ধার বড় আপা। হেনরী কেনো তাহলে বরিশালে সমস্ত আয়োজনের বাইরে নিজেকে আড়াল করে রাখলো? আবার দেখা হলে প্রশ্নগুলো হেনরীকেই করবো।

চার.
বহুমুখি আড্ডায় ছেদ পড়ে জেলা প্রশাসক শহিদুল আলমের আগমনে। তিনি এতো রাতে রসগোল্লা নিয়ে সার্কিট হাউসে এসেছেন আমাদের বহরের খোঁজ-খবর নিতে। শহিদুল আলম নিজেও কবি এবং গীতিকার। তার সঙ্গে সবার সৌজন্য আলাপ হয়। রাত গভীর হতে থাকলে আমাদের ক্ষুধা জানান দিতে থাকে। সার্কিট হাউসের ডাইনিংয়ে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন রেজা। খাবার শেষে যে যার ঘরে ফিরে যাই। কিন্তু ফিরে গেলেই কি ফিরে যাওয়া যায়? আবার একে একে সবাই জড়ো হতে থাকে জহর সেনমজুমদার এবং রবিশংকর বলের কক্ষে। আহা কবিতার জন্য এক একটি জীবনের এতো ত্যাগ, এতো বিসর্জন, এতো কষ্ট! আনন্দও কি নাই। রবিশংকর বল নিজের সঙ্গে বহন করেন কবিতার খাতা। লেখালেখির শুরুর দিকে কবিতা গ্রন্থও প্রকাশ করেছেন, এমটাই জানালেন জহর দা। কবিতার খাতা খুলে পর পর ১২ টি কবিতা পড়ে শুনালেন তিনি। উপন্যাস নিয়ে খ্যাতির চূড়ায় অবস্থান করেও কিছুতেই ছাড়তে পারছেন না কবিতার নেশা। ‘আমার কবিতা’ সংকলন থেকে অনেকগুলো কবিতা পড়লেন কবি জহর সেনমজুমদার। রাত গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে আর কবিদের কষ্ট থেকে ডাহুক পাখির কণ্ঠছেড়া রক্ত হয়ে ঝরতে থাকে কবিতার পঙক্তির পর পঙক্তি। কবি শামীম রেজার তিনটি কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আমার কথা আছে। নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে, যখন রাত্তির নাইমা আসে সূবর্ণনগরে এবং ব্রক্ষ্মাণ্ডের স্কুল । এই তিনটি কাব্যগ্রন্থকে আসলে আমার একটি কাব্যগ্রন্থের প্রারম্ভ-মধ্য এবং অন্ত বলে মনে হয়। অর্থাৎ একে আমি ট্রিলজি কাব্যগ্রন্থ বলতে চাই। তো কবি শামীম রেজা যখন পড়তে শুরু করেন—

অমরত্বের মৃত্যু হবে নালন্দা, জোছনার জলজ-অন্ধকারে।
সোমরস পান করে ঈশ্বর নামছেন সোমেশ্বরী জলে
আমি দশমাস আরাধনায় জাইগা থাকবো সোমপুরে,
         সোমেশ্বরী থেকে দূরে;
         তুমি আসবে তন্দ্রায়, চন্দ্রা নদীর ওপারে;
         আমি ঘুম-মন্দিরায় সুর তুলবো বাকি কয়মাস
         টেরাকোটার শিল্পিত খোঁদাইয়ের মাঝে।

 

কবি হেনরী স্বপনের বাড়ি

প্রকৃত অর্থেই তখন আর আমাদের চোখে ঘুম থাকে না। ভারি হয়ে আসা চোখের পাতা আবার মেলতে থাকে। আমরা পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকাই। শুধু চোখ বন্ধ করেন কবি শামীম রেজা। তারপর আমরা সবাই চোখ রাখি কানপাতি শামীম রেজার এক এক করে পড়ে যাওয়া কবিতা উচ্চারণের দিকে। রেজা যখন থামেন তখন মসজিদে মসজিদে উচ্চারিত হতে থাকে আচ্ছালাতু খাইরুম মিনান নাউম। আহা কবিতা, তোমার জন্য আরো একটি বিনিদ্র রজনী গেলো...    
 
চলবে

আগের পর্বগুলো পড়তে ক্লিক করুন—

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || ষষ্ঠ পর্ব

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || পঞ্চম পর্ব

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || চতুর্থ পর্ব

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || তৃতীয় পর্ব

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || দ্বিতীয় পর্ব

জন্মের আগে ফেলে যাওয়া স্মৃতির খোঁজে || কবির হুমায়ূন || প্রথম পর্ব

 

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।