বিকাল ০৪:২৩ ; বৃহস্পতিবার ;  ২১ নভেম্বর, ২০১৯  

নিমতলী ট্রাজেডির পাঁচ বছর: হয়নি পুনর্বাসন-বিচার, বেড়েছে রাসায়নিকের গুদাম!

প্রকাশিত:

উদিসা ইসলাম।।

আজ থেকে ৫ বছর আগে ২০১০ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার নবাব কাটরায় কেমিক্যাল গোডাউন থেকে ছড়িয়ে পড়া আগুনে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১২৪ জন।

 

‘আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। আমাদের বাড়ি ছিল ছয় নম্বরে। আগুন কিভাবে নেভানো যায় সেই চেষ্টায় ব্যস্ত। আগুন আমাদের বাড়ি পর্যন্ত ছড়িয়ে যাবে এটা ভাবিনি। ভাবার সময়ও ছিল না। মাত্র পনেরো মিনিটে সব পুড়ে ছারখার। কেমিক্যাল থাকার কারণে চোখের পলক না ফেলতেই পুরো এলাকা পুড়ে গেল। যে যেভাবে শুয়ে বসে ছিল সেভাবেই পুড়ে গেলো!’

কথাগুলো বলছিলেন সেসময় নিমতলীতে থাকা রহমান সাহেব। এখন তিনি সেই এলাকা ছেড়ে শান্তিনগরের বাসিন্দা। তিনি বলেন, আমি এলাকা ছেড়ে চলে এসেছি। কিন্তু অনেকের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে সেখানেই বাস করছেন। প্রতিটি পরিবারই হারিয়েছে এক বা একাধিক আপনজন।

সেদিন পুড়ে যাওয়া মানুষদের বাঁচাতে আগুন ধরে যাওয়া রাস্তায় দৌড় দিয়েছিলেন সোহেল রানা। রাস্তাভর্তি রাসায়নিকে তখন দাউ দাউ করছে আগুন। পায়ের ক্ষত শুকাতে তিনমাস সময় লাগলেও এখনও ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না রানা। তিনি বলেন, আমাদের এলাকার মেয়েরা যে ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে সেটা সামাল দেওয়ার কথা কেউ ভাবেনি। এখনও তারা কাজের জন্য আমাদের বাইরে যেতে দিতে ভয় পায়। এখানকার কমপক্ষে কুড়িজন নারী এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফেরেনি। তাদের শরীরের নানা অংশ ঝলসে যাওয়ায় মানসিকভাবে তারা বিপর্যস্ত।  

এদিকে পাঁচ বছর পার হলেও নিমতলী ট্র্যাজেডির ঘটনায় মামলা দায়ের বা পুনর্বাসন কোনটাই হয়নি। একরাতের আগুনের ঘটনায় শতাধিক প্রাণ যাওয়ার পর কোনও মামলা না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা। পাশাপাশি পুনর্বাসনের কথা বলা হলেও ৫ বছরে কিছুই পাননি তারা। যাদের পুরো বাড়ি পুড়ে গিয়েছিল তাদের সেখানেই কোনমতে বাস করতে দেখা গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে আগুনের শোক এতই বেশি ছিল যে কে কখন মামলা করবেন এটা কারোর মাথাতেই ছিল না। আর তারপরপরই নিমতলীর তিনকন্যার বিয়ে গণভবনে দেওয়ার তোড়জোরেও আমরা অনেক শোক ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখনও আমাদের ক্ষত শুকায়নি। ওই ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনও মামলা তো হলোই না, এই আবাসিক এলাকা থেকে এখনও অপসারিত হয়নি কেমিক্যালের গুদাম ও দোকান।

এমনকি সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে নিমতলীতে আগের চেয়েও বেশি কেমিক্যালের গুদাম গড়ে উঠেছে।

আবাসিক এলাকায় এখনও কী করে দাহ্যপদার্থের গুদাম রয়ে গেছে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্প সমিতির এ এস এম মনির হোসেন বলেন, আবাসিক এলাকায় নতুন করে কোনও কেমিক্যাল দোকানের লাইসেন্স দেওয়া দূরে থাক, পুরনোগুলোও সরিয়ে নেওয়ার সময়ও পার হয়ে গেছে। এসব কারখানাগুলোতে এমন সব দাহ্যবস্তু থাকে যার ফলে যেকোনও ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। একবার আগুন লাগলে নেভানোর সময়টুকুও পাওয়া যাবে না।

নিমতলী ট্র্যাজেডির ঘটনায় স্বজন হারানো মানিক ও মনোয়ার বলেন, ঘটনার পর সরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহযোগিতাসহ পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছিল। আমরা অপেক্ষা করেছি। আমাদের প্রতিবেশীদের অনেকের বাড়ির অভিভাবক নিহত হয়েছেন। তাদের জন্য কোনও ব্যবস্থা নিতেও দেখিনি।

মানিক বলেন, আমরা কিছু আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছি। কিন্তু সেটা ঠিক পুনর্বাসনের জন্য যথেষ্ট নয়। আমাদের দাবি, যারা এই এলাকায় কেমিক্যালের গুদাম বানানোর লাইসেন্স দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

 

/ইউআই/এফএ/

***বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কোনও সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।